অনেকেই জানেন যে, শ্রীশ্রীঠাকুরের কুষ্ঠী লেখার ঝোঁক ছিল। কোন ভক্ত গৃহে এসে নবজাত শিশু দেখলেই তার ঠিকুজী বা কুষ্ঠী লিখতে আরম্ভ করতেন।পঞ্জিকায় শুভদিন,তিথি,লগ্ন ইত্যাদিরও বাছ-বিচার করতেন। ভক্তদের যাত্রার দিনক্ষণ পঞ্জিকা দেখে ঠিক করে দিতেন। নূতন ঘর তুলতে কোন দিকে দিকশূল, কোন স্থানে কোন কোন দ্রব্য সহযোগে প্রথম খুঁটি বা ইট স্থাপন করতে হবে, সে সব ও ব্যবস্থা করে দিতেন।
অনেকে কন্যার বিবাহের পাকা কথা দেবার পূর্বে ঠাকুরের অনুমতি নিতে আসতেন। অনেকে আবার ব্যাখ্যা করে সম্বন্ধটির উৎকর্ষতা নিজেরাই প্রমাণ করতেন। ঠাকুর ছোট্ট একটি—'হ' বলে অনুমতি দিতেন। এরূপ ক্ষেত্রে কন্যার অকাল বৈধব্য ঘটলে কোন কোন ব্যক্তি এরূপও বলতেন, ঠাকুর অনুমতি দিলেন,তবে এমন সর্বনাশ হল কেন?— অজ্ঞান বশতঃ আমরা প্রাক্তনের ফল কৌশলে এড়াতে চাই।
যতদূর মনে পড়ে সে হল ইং১৯৩৬ সনের কথা। ঠাকুর বলতে শুরু করলেন, তাঁর বিষম রাহুর দশা।স্পষ্টই বলতে লাগলেন যে এই দুরন্ত রাহুর দশার অচিরে প্রতিবিধান প্রয়োজন। ভক্তদের মধ্যেও আলোচনা হতে লাগলো যে, ঠাকুর রাহুগ্রস্ত, এর অর্থ কি?
ঠাকুর প্রকাশ করলেন যে, একজন নমঃশুদ্রের সহিত তাঁর মিতালি করতে হবে ; তা হলেই দুষ্ট দশার অবসান হবে।তখন আমাদের চিন্তা হলো, কোথায় ঠাকুরের এমন মিত্র মিলবে। শহরের বাইরে এদিক ও-দিক খুঁজতে খুঁজতে শ্রীহরিদাস আচার্য্য ঠাকুরের একজন মিতার আবিষ্কার করলেন।
একদিন সেই নমঃশুদ্র বন্ধুটিকে সাধু দর্শনে আনা হল।
বন্ধুটি তখন নিঃসন্দেহে ৭০ বৎসর অতিক্রম করেছেন। ঘোর কৃষ্ণবর্ণ,জীর্ণ-শীর্ণ অশক্ত দেহ।কোনমতে লাঠি ভর দিয়ে চলতে পারেন।
বন্ধুপ্রবরকে শ্রীশ্রীঠাকুরের নিকট হাজির করা হল।ঠাকুর সসম্ভ্রমে বন্ধুটিকে আলিঙ্গন করলেন।বন্ধুতো একেবারে ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে গেলেন। বন্ধুকে ঠাকুরের পাশে বসানো হল।বন্ধুর শঙ্কা ও বিস্ময়-জড়িত দৃষ্টি দেখে মনে হল যে,তিনি হয়ত ভাবছেন; এরা আমাকে নিয়ে এসব কি কচ্ছে!
কিন্তু ঠাকুর মিতাকে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন যে, তাঁর মিতা সহজ মানুষ নন।তিনি ঠাকুরকে মিত্রতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন। ঠাকুরের কতকগুলি কথা যে মিত্র মহাশয় আদৌ অনুধাবন করতে পারলেন না, তাহা বুঝতে কাহারো বাকী থাকলো না।
এরপর বন্ধুকে নতুন কাপড় চাদর পরিয়ে পরম যত্ন সহকারে ভোজন করানো হল।বন্ধুটি বিশ্রামান্তে অপরাহ্নে ঠাকুরকে প্রণাম করে বিদায় নিলেন।
পরবর্তীকালে বন্ধুকে ভক্তরা যথেষ্ট আদর যত্ন করতেন। সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞাসা করলে বন্ধু বলতেন, ''সবই ঠাকুরের খেলা আমি কিছুই বুঝতে পারি না।"
ঠাকুরের এই মিতালির ব্যাপারটি নিশ্চয়ই দুর্বোধ্য। তবে একথা ভক্তরা জানেন যে, ঠাকুর নাম দিতে জাতিবর্ণের বাছ-বিচার করতেন না। কতিপয় মুসলমানও তাঁহার প্রতি অতিশয় শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন।
আমরা ইহাও জানি যে সমাজে নিতান্ত দুর্নীতিপরায়ণ ও চরিত্রভ্রষ্ট বলে পরিচিত ছিলেন,তারাও ঠাকুরের করুণালাভে বঞ্চিত হন নি।ঠাকুর কখনো কারো চরিত্রহীনতার জন্য ভর্ৎসনা করতেন না বা নাম প্রদানে কার্পণ্য করতেন না। সময়ে নামের দিব্য প্রভাবের চরিত্রের পরিবর্তন হত বলেই বিশ্বাস করি।শ্রীশ্রীঠাকুর নিরাশ্রয়ের আশ্রয়, পতিতের নির্ভর এবং কাঙালের দয়াল ঠাকুর।
শ্রীশ্রীঠাকুর রামচন্দ্রদেব
শ্রী সুশীল চন্দ্র দত্ত
বি এ বি টি