আমি জানি যে, ঠাকুরের নিদ্রাও ছিল না। তিনি নিজেই বলিয়াছেনঃ “ঘুম তো আসে না, ঘুম আসিলেই তো মোহ আসিয়া গেল।” কিন্তু কথাটা অন্যকে বোঝান সহজ হইবে না এবং এ সম্বন্ধে মত বিরোধেরও সম্ভাবনা আছে। আমরা যেমন রাত্রিতে আহারাদির পর বিছানায় যাইয়া শুইয়া পড়ি এবং ধীরে ধীরে ঘুমাইয়া পড়ি, ঠাকুরও সেইরূপ মশারির ভিতরে বিছানায় যাইয়া শুইতেন এবং চক্ষু মুদিয়া এমন ভাবে থাকিতেন যে, মনে হইত যে তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন। সুতরাং ইহা যে নিদ্রা নহে, অন্য কিছু, তাহা প্রমাণ করা সহজসাধ্য নহে। এ সম্বন্ধে আমার নিজের যাহা বক্তব্য আছে তাহাই শুধু বলিতে পারি, গ্রহণ করা না করা, পাঠক-পাঠিকার ইচ্ছা। আমার জীবনে ঠাকুরের সহিত একাকী রাত্রি কাটাইবার সুযোগ কয়েকবারই হইয়াছে। একদিন আমার বিডন স্ট্রীটের বাসায় ভিতরের একখানা ঘরে আমার ও ঠাকুরের শোয়ার ব্যবস্থা করা হইল। খাটের উপর ঠাকুরের বিছানা পাতিয়া দেওয়া হইল এবং আমার বিছানা হইল মেঝের উপর। খানিকক্ষণ কথাবার্ত্তার পর মশারি টানাইয়া আলো নিভাইয়া দুইজনেই শুইয়া পড়িলাম। আমার কিন্তু ঘুম আসিল না, বিছানায় এপাশ ওপাশ করিতে লাগিলাম। ঘড়িতে ১২টা বাজিতে শুনিয়া বুঝিলাম যে, এক ঘণ্টার উপর এই ভাবে কাটাইয়াছি। রাস্তার আলোতে ঘরেও খানিকটা আলো ছিল, ঠাকুরের খাটের দিকে চাহিয়া দেখিলাম যে, তিনি স্থির হইয়া বসিয়া রহিয়াছেন। দেখাদেখি আমিও উঠিয়া বসিলাম এবং একটু পরে ঠাকুর বলিলেনঃ “উঠিয়া বসিলেন যে ?” আমি বলিলাম যে, ঘুম আসিতেছে না, তাই। তখন ঠাকুর বলিলেন: “তা হইলে এক কাজ করেন, মশারি তুইলা রাইখা আলো জ্বালাইয়া দেন।” আমি তৎক্ষণাৎ মহানন্দে ঠাকুরের আদেশ তামিল করিলাম। তিনি নানা বিষয়ে কথা বলিয়া চলিলেন, বেশ মনে আছে যে, সে রাত্রিতে তিনি তাঁহার জীবনের অনেক গুহ্য কথা আমাকে জানাইয়াছিলেন। কিভাবে যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলিয়া গেল কিছুই বুঝিতে পারিলাম না। হঠাৎ চাহিয়া দেখি যে, ভোর হইয়া গিয়াছে। ঠাকুরের সঙ্গে এই প্রকার সারারাত্রি জাগরণ আমার অন্ততঃ দশবার ঘটিয়াছে কিন্তু প্রতিবারেই লক্ষ্য করিয়াছি যে, রাত্রি জাগরণের যে একটা স্বাভাবিক গ্লানি ও ক্লান্তি আছে, তাহার বিন্দুমাত্রও ঠাকুরকে স্পর্শ করে নাই। তিনি প্রত্যহ যেমন থাকেন তেমনই রহিয়াছেন, কোন ব্যতিক্রমই হয় নাই। আমরা হয়তো দিনে ৩/৪ ঘণ্টা ঘুমাইয়া রাত্রি জাগরণের অবসাদ দূর করিতে চেষ্টা করিয়াছি কিন্তু ঠাকুরের সে রকম কোন প্রয়োজনই হয় নাই। অন্যান্য দিন যেমন সমাগত ভদ্রমণ্ডলীর সহিত আলাপ আলোচনা করিয়া এবং কখন হয়তো বা সামান্য একটু বিশ্রাম করিয়া কাটাইয়া দেন, রাত্রি জাগরণের পরের দিনগুলিও হুবহু সেইভাবেই কাটাইয়াছেন। এমনও অনেকবার হইয়াছে যে, ঠাকুরকে আনিতে হাওড়া বা শিয়ালদহ ষ্টেসনে গিয়াছি, ঠাকুর একখানা প্যাসেঞ্জার ঠাসা তৃতীয় শ্রেণীর কামরা হইতে নামিয়াছেন, সারারাত্রি বসিয়াই আসিয়াছেন কিন্তু কোন ক্লান্তি বা গ্লানির চিহ্নমাত্রও তাঁহাতে দেখি নাই। স্বভাবতঃই মনে হইয়াছে যে, নিদ্রার কোন প্রয়োজনই তাঁহার নাই, নতুবা জাগরণের অবসাদ অন্ততঃ কিছু না কিছু প্রকাশ হইয়া পড়িতই।
রামঠাকুরের কথা
ডঃ ইন্দুভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়